
আতিকুর রহমান, রাজশাহী: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ পৌরসভায় জনপ্রতিনিধির পরিবর্তন হয়েছে, প্রশাসনিক নেতৃত্বেও এসেছে নতুন মুখ। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবর্তন ঘটেনি পৌরসভার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়। বরং সহকারী প্রকৌশলী ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) লিটন মিয়াকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় এখনো পৌরসভার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সক্রিয় রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প অনুমোদন, উন্নয়নকাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল ছাড়, ঠিকাদার নির্বাচন থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো তার প্রভাব বিদ্যমান। প্রশাসক দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে অনেক সিদ্ধান্ত অনানুষ্ঠানিকভাবে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পরও কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি বলে মনে করছেন পৌর এলাকার সাধারণ মানুষ।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করায় পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সঙ্গে লিটন মিয়ার একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের বলয় তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, জনপ্রতিনিধি পরিবর্তন হলেও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে সেই প্রভাবের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
এরই মধ্যে দুর্নীতির মামলায় ভবানীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র আব্দুল মালেক মণ্ডল কারাগারে থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে যেসব উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, সেসব ঘটনায় অভিযুক্ত অন্যদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন থেকেই গেছে।
পৌরসভা সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ বাগমারা প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় কয়েকজন কাউন্সিলর ভবানীগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনেন। লিখিত বক্তব্যে তারা উল্লেখ করেন, ২০১৯ সালে ইজিপির আওতায় প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প আংশিক বাস্তবায়ন করেই সম্পূর্ণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এছাড়া ২০২২ সালের কোটেশন টেন্ডারের ৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা এবং ৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়ের দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়াই অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। চলতি অর্থবছরের ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার একটি কাজেও একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
এসব ঘটনায় সাবেক মেয়র আব্দুল মালেক মণ্ডল, প্যানেল মেয়র হাচেন আলী, দোলাহার হোসেন এবং সহকারী প্রকৌশলী ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) লিটন মিয়ার যোগসাজশের অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় তদন্ত শুরু করে। তবে ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জুন পর্যন্ত প্রায় দুই বছর তিন মাস সাত দিন অতিবাহিত হলেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তদন্ত চলাকালে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরের মাধ্যমে তদন্তের গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। তাদের দাবি, লিটন মিয়া মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি নিশ্চিত করেন। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, পৌরসভার রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, পানি সংযোগ ফি ও অন্যান্য খাত থেকে আদায়কৃত অর্থের পুরোটা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আংশিক জমা এবং বাকি অর্থ বিকল্প খাতায় সংরক্ষণ করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এতে পৌরসভার প্রকৃত রাজস্ব আয় ও সরকারি হিসাবের মধ্যে অসঙ্গতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পৌরসভার একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, প্রশাসক দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনানুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়। কোন প্রকল্প অনুমোদিত হবে, কে কাজ পাবে, কখন বিল ছাড় হবে কিংবা কোন কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রভাববলয়ের মতামতই বেশি কার্যকর হয় বলে অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার এক কর্মচারী বলেন, “কাগজে-কলমে প্রশাসক থাকলেও বাস্তবে অনেক সিদ্ধান্ত অন্যভাবে প্রভাবিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে একই ধারা চলে আসছে।”*
পৌরসভার এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “একই জায়গায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব তৈরি হয়। কিন্তু সেই প্রভাব যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সেটি তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত।”
স্থানীয় এক ঠিকাদারের দাবি,”দরপত্র সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও বাস্তবে কারা কাজ পাবেন, তা নিয়ে আগেই আলোচনা হয়ে যায়—এমন ধারণা ঠিকাদারদের মধ্যে রয়েছে। ফলে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।”*
একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিভিন্ন অনুমোদন এবং পৌরসভার প্রশাসনিক সেবা পেতে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখে পড়তে হয়। তাদের দাবি, এসব বিষয়ে অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় এক সমাজকর্মী বলেন, “জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।”*
একজন প্রবীণ নাগরিকের ভাষ্য,”দুই বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত চললেও যদি কোনো দৃশ্যমান ফল না আসে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।”
এদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, ড্রেন, সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, একই কাজ একাধিকবার দেখিয়ে বরাদ্দ উত্তোলন এবং বাস্তবে কাজ সম্পন্ন না করেই কাগজে শতভাগ বাস্তবায়ন দেখানোর মতো অনিয়ম ঘটেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক কাউন্সিলর বলেন, “আমরা আগেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, সংবাদ সম্মেলন করেছি। কিন্তু তদন্তের দৃশ্যমান ফল পাইনি। তাই আমরা আবারও সব প্রকল্পের নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।”
বর্তমানে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীসহ পূর্বে অভিযোগ তোলা কাউন্সিলররা আবারও ভবানীগঞ্জ পৌরসভার সব উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার, বিল পরিশোধ, রাজস্ব আদায় এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা (অডিট) ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিষ্ঠানগত জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক অডিট এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঠপর্যায়ের যাচাই ছাড়া প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয়।
যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের রাজশাহী জেলার উপপরিচালক উম্মে কুলসুম সম্পার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।