
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে ২ হাজার ৯২০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৫৩টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে ক্ষতিপূরণ ও পাওনা বাবদ প্রায় পৌনে ৩ কোটি টাকা আদায় করে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪৩৪টি মামলায় আইনগত সহায়তা এবং ১ হাজার ৮৮৯ জনকে বিনা খরচে আইনগত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লিগ্যাল এইড অফিসের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সেবা নিতে আসা মানুষের অভিজ্ঞতাও বলছে, আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও ব্যয়ের বাইরে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের জন্য বিনা খরচে আইনি সহায়তার সুযোগটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে নাসরিন খাতুনের মতো অসংখ্য মানুষের গল্প। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের তৃতীয় তলায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সামনে কোলে ছোট সন্তান নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তিনি।
নাসরিনের অভিযোগ, দুই বছর ধরে তাঁর স্বামী ভরণপোষণ দেন না, এমনকি খোঁজখবরও নেন না। আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিজের অধিকার আদায়ে সরকারি আইনি সহায়তার দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।
নাসরিন বলেন, “আমি গরিবের মেয়ে। টাকা-পয়সা খরচ করার সামর্থ্য নেই। এজন্য লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগ জানিয়েছি। গত মাসে তারিখ ছিল, কিন্তু আমার স্বামী উপস্থিত হয়নি। আজ আবার এসেছি, দেখা যাক কী হয়।”
কোলে ছোট সন্তান নিয়ে তাঁর এই অপেক্ষায় যেমন রয়েছে অসহায়ত্ব, তেমনি রয়েছে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের তৃতীয় তলায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। পারিবারিক কলহ, ভরণপোষণ, সামাজিক বিরোধ, পাওনা টাকা আদায়সহ বিভিন্ন বিষয়ে মানুষ এখান থেকে আইনি সহায়তা নিচ্ছেন।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনায় বসানো হয়। উভয় পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছালে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়েই বিরোধের নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হয়।
শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, আদালতে মামলা করতে গেলে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ সময়ও লাগে। লিগ্যাল এইডে বিনা খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ থাকায় মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর এলাকার আমিনুল হকের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক। তাঁর মতে, প্রচলিত গ্রাম্য সালিশের তুলনায় লিগ্যাল এইডে বিরোধ নিষ্পত্তির পরিবেশ বেশি নিয়মতান্ত্রিক।
তিনি বলেন, “গ্রামে অনেক লোকজন নিয়ে সালিশে বসলে অনেক সময় হইচই হয়, কিন্তু সমাধান হয় না। লিগ্যাল এইডে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মীমাংসা হওয়ায় দুই পক্ষই উপকৃত হন।”
নাচোল উপজেলার মরিয়ম বেগমের জীবনেও রয়েছে বিরোধের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ভাইদের সঙ্গে বিরোধের কারণে একসময় তাঁকে আদালতে ঘুরতে হয়েছে। এবার মেয়ের পারিবারিক অশান্তির সমাধানের আশায় লিগ্যাল এইড অফিসে এসেছেন তিনি।
মরিয়ম বলেন, “ভাইদের সঙ্গে বিরোধ নিয়ে আদালতে অনেক ঘুরেছি। এখন আমার মেয়ের পারিবারিক অশান্তি। তাই লিগ্যাল এইডে অভিযোগ জানাতে এসেছি।”
সুন্দরপুর ইউনিয়নের গোলাপের হাট এলাকার রুমালি বেগমের পরিবারেও সম্পত্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তাঁর স্বামী দুই স্ত্রী ও দুই পক্ষের পাঁচ সন্তান রেখে দুই বছর আগে মারা যান। এরপর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। পরে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান হয়েছে বলে জানান তিনি।
একটি বিরোধ কখনো শুধু কাগজপত্রের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সম্পর্ক, সংসার, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভ। সমঝোতার মাধ্যমে একটি বিরোধের অবসান হলে শুধু একটি নথির নিষ্পত্তি হয় না, অনেক সময় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথও তৈরি হয়।
তবে সেবা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা ও কার্যক্রম বাড়লেও সে অনুপাতে জনবল না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসলাম-উদ-দৌলা। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য সরকারের এই জনবান্ধব সেবা আরও কার্যকর করতে পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ কয়েকটি লিগ্যাল এইড অফিসকে মডেল হিসেবে গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি।
আইনি অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। চলতি সময়ে তৃণমূল পর্যায়ে সভা, সেমিনারসহ ২৫টি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। শুধু আদালত ভবনকেন্দ্রিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছেও আইনগত সহায়তার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব সভায় মানুষের আইনগত অধিকার, সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে জানানো হয়।
সচেতনতামূলক এসব সভায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার আবু সাঈদও উপস্থিত থাকেন। তিনি বলেন, “ন্যায়বিচার কোনো দয়া নয়; এটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার।” এই উপলব্ধি থেকেই সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট বিকল্প উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
খবর২৪ঘন্টা/মইসে
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।