
রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী: রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত সচিব ও সহকারী প্রকৌশলী সারওয়ার জাহান মুকুল—গোদাগাড়ী পৌরসভার এই কর্মকর্তার নাম এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। অভিযোগ, তিনি শুধু একজন কর্মকর্তা নন; মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এমন এক ক্ষমতাকেন্দ্র, যার ইশারা ছাড়া পৌরসভায় একটি টাকাও নড়ত না। পলাতক সাবেক মেয়র অয়েজুদ্দিন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ থাকলেও স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের আসল চাবিকাঠি দীর্ঘদিন ছিল সারওয়ার জাহানের হাতেই।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠলেও প্রতিবারই তা রহস্যজনকভাবে ধামাচাপা পড়ে গেছে। “উপর মহল ম্যানেজ” করার ক্ষমতার কারণেই তিনি বছরের পর বছর বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ তাদের।
একাধিক কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মেয়র বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু সারওয়ার জাহানের দাপট কমেনি। প্রকৌশল বিভাগ ও সচিবালয়—দুই ক্ষমতাই এক হাতে থাকায় তিনি কার্যত পৌরসভার অঘোষিত নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন।”
২৫ ভুয়া প্রকল্পের অভিযোগেও অটুট প্রভাব
সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ৭ অক্টোবর উপনির্বাচনের মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর অয়েজুদ্দিন বিশ্বাসের প্রথম সভাতেই ২৫টি প্রকল্প কাগজে সম্পন্ন দেখিয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প অনুমোদন, কাজের পরিমাপ, বিল প্রস্তুত ও অর্থ ছাড়—পুরো প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ছিলেন সারওয়ার জাহান।
অভিযোগ আরও রয়েছে, সাবেক মেয়র তার ছেলে রায়হান বিশ্বাসকে বিকল্প লাইসেন্স ব্যবহার করে একাধিক উন্নয়ন কাজ দেন। কাজের মান যাচাই ও কারিগরি ছাড়পত্রেও সারওয়ার জাহানের নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সাবেক মেয়রের পাশাপাশি সারওয়ার জাহানের ব্যক্তিগত সম্পদও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। তাদের আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য নেই বলেই দাবি এলাকাবাসীর।
পলাতক মেয়র, বহাল প্রকৌশলী
অয়েজুদ্দিন বিশ্বাস বর্তমানে পলাতক। কিন্তু পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত সচিব ও সহকারী প্রকৌশলী সারওয়ার জাহান মুকুল এখনো স্বপদে বহাল। এ নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—যার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ, তিনি কীভাবে এখনো দায়িত্বে আছেন?
স্থানীয়দের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী চক্র তাকে রক্ষা করছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার ভূমিকা স্পষ্টভাবে না আসা, বিভাগীয় তদন্ত শুরু না হওয়া এবং দুদক বা অন্য কোনো স্বাধীন সংস্থার তদন্ত না হওয়াকে তারা সেই প্রভাবেরই ফল মনে করছেন।
নতুন করে ১০ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
পুরোনো অভিযোগের সুরাহা না হতেই নতুন করে সামনে এসেছে ১০ কোটি ১৯ লাখ টাকার সড়ক সংস্কার প্রকল্প। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) আরইউটিডি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪ হাজার ৯৮০ মিটার সড়ক ও ১ হাজার ২০০ মিটার ড্রেন নির্মাণকাজ চলছে।
প্রধান ঠিকাদার ঢাকার এমএ ইঞ্জিনিয়ারিং হলেও কাজটি সাব-কন্ট্রাক্টে করছে রাজশাহীর এলিজা এন্টারপ্রাইজ।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ড্রেন নির্মাণে নিম্নমানের ইটের খোয়া, বালু ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। কয়েকটি স্থানে সামান্য আঘাতেই ঢালাইয়ের পাথর ভেঙে যেতে দেখা গেছে। বৃষ্টির মধ্যেও ঢালাই কাজ চলছিল।
ভগবন্তপুর এলাকায় বৃষ্টির মধ্যে কাজ চলার বিষয়ে উপস্থিত উপসহকারী প্রকৌশলী হারেস শেখ বলেন, “বালু ও সিমেন্ট আগে থেকেই মেশানো ছিল, তাই কাজ বন্ধ করা হয়নি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, যেখানে ছয় ইঞ্চি বালু ভরাটের শর্ত রয়েছে, সেখানে চার ইঞ্চি দেওয়া হচ্ছে। সুলতানগঞ্জ এলাকায় গাইডওয়ালে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। নিম্নমানের কাজের প্রতিবাদে স্থানীয়রা দুই দফা কাজ বন্ধ করে দেন।
নতুন অভিযোগ সামনে আসতেই ‘ম্যানেজ’ তৎপরতা
পৌরসভা সূত্র বলছে, ১০ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর সারওয়ার জাহান ইতিমধ্যে ওপর মহলে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। অতীতের মতো এবারও অভিযোগ ধামাচাপা দিতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
একজন সাবেক কাউন্সিলর বলেন, “গোদাগাড়ীতে অভিযোগ ওঠে, তদন্তের কথা হয়, তারপর সব থেমে যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের ছায়া এসে পড়ে।”
স্থানীয়দের দাবি, দুদক বা অন্য কোনো নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে জরুরি তদন্ত, প্রকল্পের কারিগরি অডিট, সংশ্লিষ্টদের সম্পদের উৎস যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
গোদাগাড়ীর এক প্রবীণ বাসিন্দার কথায়, “মেয়র পালিয়েছেন, কিন্তু যাদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ছিল তারা এখনো বহাল। তাই মানুষের প্রশ্ন—গোদাগাড়ীতে উন্নয়ন হচ্ছে, নাকি মন্ত্রণালয়ের ছত্রছায়ায় কোটি টাকার লুটপাট?”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
গোদাগাড়ী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে এলজিইডি রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খবর২৪ঘন্টা/জিগসে
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।