
বিশেষ প্রতিবেদক: কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পশুর বাজার রাজশাহীর সিটি হাট এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর। প্রতিদিন হাজার হাজার গবাদিপশু এই হাট থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। তবে পশু পরিবহনের সঙ্গে জড়িত ট্রাকচালক ও মালিকদের অভিযোগ, মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদাবাজির কারণে তারা চরম ভোগান্তি ও আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন রাজশাহীর সিটি হাটে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার গরু, ছাগল ও মহিষ বিক্রি হচ্ছে। এসব পশুর বড় একটি অংশ ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ফেনী ও নোয়াখালীর বিভিন্ন পশুর হাটে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিরাতে সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ পশুবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে রওনা দেয়।
সোমবার (২৫ মে) সিটি হাটে গিয়ে বিভিন্ন জেলার ট্রাকচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজশাহী থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে একটি ট্রাককে অন্তত পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে। চট্টগ্রামগামী ট্রাকগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যয় আরও দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেড়ে যায়। চালকদের ভাষ্য, পথে পথে পুলিশি চেকিং, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজির কারণে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
ভুক্তভোগী চালকেরা জানান, রাজশাহী সিটি হাট থেকে ট্রাক বের হওয়ার পর প্রথমেই নগরের উপকণ্ঠ বেলপুকুর এলাকায় তাদের থামানো হয়। সেখানে পুলিশ পরিচয়ে ট্রাকপ্রতি ৫০০ টাকা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তির নামে আরও ৩০০ টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর পুঠিয়া এলাকায় পবা হাইওয়ে থানার অংশে আবারও চাঁদা দিতে হয়। সেখানে হাইওয়ে পুলিশের নামে ৫০০ টাকা এবং স্থানীয় কিছু বখাটের জন্য আরও ২০০ টাকা আদায় করা হয় বলে দাবি চালকদের। একইভাবে নাটোরের বনপাড়া, সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্ত, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা ও সখীপুর, গাজীপুরের গোড়াই ও চৌরাস্তা এলাকায়ও বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
চালকদের অভিযোগ, রাজধানীর গাবতলিতে প্রবেশের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। গাবতলি ছাড়াও শনির আখড়া, মদনপুর, গাউসিয়া ও আড়াইহাজার এলাকায় ট্রাক থামিয়ে ৫০০ টাকা করে আদায় করা হয়। চট্টগ্রামমুখী ট্রাকগুলোকে কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অংশে আরও কয়েক দফা একই ধরনের চাঁদা দিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাকচালকদের ভাষ্য, অনেক সময় গাড়ির কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখে সামান্য ত্রুটি পেলেই মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাক আটকে রেখে পরে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার কোথাও কোথাও মহাসড়কের পাশে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিরা সরাসরি ট্রাক থামিয়ে অর্থ আদায় করেন।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে রাজশাহী থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি পশুবাহী ট্রাকের ভাড়া প্রায় ৪০ হাজার টাকা এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। কিন্তু জ্বালানি খরচ, শ্রমিক ব্যয় ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত চাঁদার চাপ যুক্ত হওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজশাহী ট্রাক মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সাদরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন নয়। সিটি হাটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রাক আসা-যাওয়া করে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এই অবৈধ আদায়।
অভিযোগের বিষয়ে বগুড়া হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার আবু তোরাব মোহাম্মদ শামসুল আলম বলেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজি নিয়ে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাইওয়ে পুলিশের উত্তরাঞ্চলের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আব্দুল্লাহ হিল বাকী বলেন, ঈদকে সামনে রেখে পশুবাহী যানবাহনের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে মহাসড়কে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোথাও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খবর২৪ঘন্টা/এসএফ
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।