আজ বুধবার, ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে দুদক পরিচালকের ঘুষ নেয়ার কথোপকথন

খবর ২৪ ঘণ্টা ডেস্ক: নারী কেলেঙ্কারি, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশের ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে এবার ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালকের বিরুদ্ধে।

বিতর্কিত ডিআইজি মিজান রোববার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেন।

টেলিভিশনে প্রচারিত ওই ‘বিশেষ সংবাদে’ ঘুষ লেনদেনের স্বপক্ষে ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মোবাইল কথোপকথনের কয়েকটি অডিও ক্লিপও শোনানো হয়।

এই অভিযোগ ওঠার পর রোববারই দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখতকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রনব কুমার ভট্টাচার্য্য। কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে (সোমবারের মধ্যে) এই বিষয়ে কমিশনকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) সাঈদ মাহবুব খান এবং মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মফিজুল ইসলাম ভূইয়া।

দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির বলেন, অনুসন্ধানের দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই ২০১৮ সালের অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে ডিআইজি মিজান নিজে থেকে আমার দপ্তরে আসেন। এরপর তার সঙ্গে আমার কিছুক্ষণ সামাজিক কথাবার্তা হয়। আমার ছেলেকে স্কুলে আনা-নেয়ার কথাও প্রসঙ্গক্রমে বলা হয়। কিন্তু কোনো ধরনের ঘুষ লেনদেন হয়নি। এই বিষয়ে কোনো কথাবার্তাও তার সাথে হয়নি।

দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডিআইজি মিজান পুলিশের উচ্চপদে থেকে তদবির, নিয়োগ, বদলিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগ পায় দুদক। অভিযোগ যাচাইবাছাই শেষে অনুসন্ধানের জন্য ২০১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কমিশনের উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়।

পরে ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীকে বাদ দিয়ে পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। এনামুল বাছির অনুসন্ধানকালে ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ১৫ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি রমনাপার্কে ঘুষ নেন বলে তথ্য পেয়েছে কমিশন। পাশাপাশি ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মধ্যে কথোপকথনের তিনটি অডিও রেকর্ড পেয়েছে কমিশন।

প্রথম রেকর্ড :

ডিআইজি মিজান : …আপনার জন্য কিছু বই এনেছি, এগুলোয় আইনের বইটই আছে।

এনামুল বাছির :…নিয়া আছেন টাকা.. কোন ফর্মে আনছেন?…বাজারের ব্যাগে… না…

ডিআইজি মিজান : … বাজারের ব্যাগে।

এনামুল বাছির :… এগুলা কি…

ডিআইজি মিজান :… বই আছে এতে।

এনামুল বাছির : … কী বই?

ডিআইজি মিজান :…আইনের বইটই আছে…আমি আজকে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আইনের বই কিনলাম…।

এনামু বাছির :… ও

ডিআইজি মিজান :… বড় ভলিউম না, এই টুয়েন্টি ফাইভতো…তেমন বড় ভলিউম না, সব এক হাজার টাকার নোট।

এনামুল বাছির :… আচ্ছা।

অপর একটি অডিও রেকর্ডে বলা হয়েছে, অনুসন্ধানে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ঘুষ দুর্নীতির কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। চাইলেই কমিশনের অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেন।

দ্বিতীয় রেকর্ড :

ডিআইডি মিজান :… কমিশন আমাকে হ্যারেস করছে।

এনামুল বাছির :… জি ইনকোয়ারি রিপোর্ট আমি দেখেছি… এটা একটা ভুয়া রিপোর্ট। আইওর রিপোর্ট আমি চাইলে কমিশনে দিতে পারি। আমি দিলে অফিসে কোনো কোশ্চেন হয় না। উনারাও (কমিশন) বুঝতেছে আপনাকে ধরা যাবে না।

ডিআইজি মিজান : …জি ধরা যাবে না।

এনামুল বাছির : …আমি আপনার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ চাই। এটা হইলো কথা। বাকিগুলো হইলো…

ডিআআইজি মিজান : …না না শুনেন আর ২৫ লাখ টাকা আমাকে নেক্সট ৮-১০ দিন সময় দিলে আমি ম্যানেজ করে ফেলব।

এনামুল বাছির : …এত সময় দেওয়া যাবে না, আগামী সপ্তায়…

ডিআইজি মিজান : আচ্ছা

এনামুল বাছির : …আর হইলো কি, আমার ছেলেটা উইলসে পড়ে…

ডিআইজি মিজান : …উইলসে পড়ে?

এনামুল বাছির : ওরে আনা-নেওয়ার জন্য একটা গাড়ি…

ডিআইজি মিজান : …গ্যাসের গাড়ি?

এনামুল বাছির : …সকাল ৯টায় স্কুলে দিবে আর দুপুর ১২টায় বাসায় পৌঁছে দিবে, এটাই আমার চাহিদা আর কোনো চাহিদা নাই।

অপর একটি অডিও রেকর্ডে এনামুল বাছির ও ডিআইজি মিজানের মধ্যে বেনামে হিসাব খোলা ও বাহক চেক মারফত টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়।

এনামুল বাছির : …এমন একটা অ্যাকাউন্টে রাখা দরকার যেখানে আমি বাট আই কেন অপারেট হেয়ার। এটা মোটামুটি একটা পারমান্যান্ট অ্যাকাউন্ট যেটা আমি…। কারণ আপনার মতো আরও কেউ তো আসতে পারে।

ডিআইজি মিজান :… জি

এনামুল বাছির :…আমি বলতে চাইছি সেটা না, আপনার মতো যদি এ রকম চিপার মধ্যে পড়ি, তখনতো আরেকজনের কাছ থেকেও আমার নিতে হবে।

ডিআইজি মিজান :… হা-হা-হা

এনামুল বাছির :… চেকটা আমি সই করলাম

ডিআইজি মিজান :…হ্যাঁ, হ্যাঁ

এনামুল বাছির :… ইন আদার নেইম, দিয়ে আমি চেকটা সই করলাম, মনে করেন এটা ফেইক অ্যাকাউন্ট, ফেইক পারসনের হতে হবে।

ডিআইজি মিজান :… আপনার নাম লিখে দিলে হবে

এনামুল বাছির :… আমার নামতো লেখাই যাবে না

ডিআইজি মিজান :… কার নাম থাকবে তাহলে?

এনামুল বাছির :… ব্ল্যাঙ্ক থাকবে

ডিআইজি মিজান :… ওকে ওকে…ব্ল্যাঙ্ক

এনামুল বাছির :… যার নামই থাকবে বেয়ারার গিয়ে নিয়ে আসবে অ্যাকাউন্ট থেকে।

তৃতীয় অডিও রেকর্ড :

গত ৩০ মে পুলিশ প্লাজায় ডিআইজি মিজানের স্ত্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মিজানের সঙ্গে দেখা করেন খন্দকার এনামুল বাছির। তার একটি সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পেয়েছে দুদক। তাতে দেখা যায় অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগাম তথ্য ডিআইজি মিজানকে জানায় দুদক।

সেখানকার আরেকটি অডিও ক্লিপ পেয়েছে দুদক।

এনামুল বাছির :… অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে… এর ভেতরেও কিছু পয়েন্ট রেখেছি। চেয়ারম্যান এবং কমিশনারের চাপে বাধ্য হয়েছি। এ রকম একটা রিপোর্ট।

ডিআইজি মিজান :… মামলা কেন হবে? আপনি তো বললেন….

এনামুল বাছির : …আপনি একটা জিনিস বোঝেন! আমি কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি সময় আগে রিপোর্ট দিছি। কোনো মিডিয়ায় কি কোনো কথা আসছে? আপনি যদি চান ওসব (ঘুষের টাকা) ফেরত নিতে পারেন।

ডিআইজি মিজান :… দরকার নাই

এনামুল বাছির : … আমি যখন চেয়ারম্যানকে বললাম, চেয়ারম্যান মানে পারে…তো আমাকে মেরেই ফেলবে।

দুদক পরিচালককে কেন ঘুষ দিলেন সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ডিআইজি মিজান বলেন, আমি বাধ্য হয়েছি। আমি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছি। আমি কোনো অন্যায় করেনি। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তা হলে এ দেশে কখনো দুর্নীতি দমন হবে না।

উল্লেখ্য, এক নারীকে জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে করার অভিযোগে আলোচনায় আসনে ডিআইজি মিজান। এই অভিযোগে ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনারের (ডিআইজি) পদ থেকে মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

খবর২৪ঘণ্টা, জেএন


Download our Mobile Apps Today