
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীতে এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পৌঁছে দিতে গিয়ে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন এক সরকারি কর্মকর্তা। দায়িত্ব পালনকালে বেপরোয়া ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত পবা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ও কাশিয়াডাঙ্গা কলেজ এইচএসসি কেন্দ্রের ট্যাগ অফিসার মো. সুলতানুল ইসলাম (৫৪) বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকেরা তাঁর জীবন রক্ষায় হাঁটুর নিচ থেকে দুই পা কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন।
বুধবার (২৯ জুলাই) সকাল ৯টার দিকে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাইপাস মহাসড়কের কাশিয়াডাঙ্গা কলেজের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, সকাল সাড়ে আটটার দিকে কাশিয়াডাঙ্গা থানা থেকে এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে সরকারি মোটরসাইকেলে কেন্দ্রের উদ্দেশে রওনা হন সুলতানুল ইসলাম। কলেজের সামনে পৌঁছালে যশোর ট-১১-৩০১৩ নম্বরের একটি ট্রাক বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। তিনি সড়কে ছিটকে পড়লে ট্রাকটি তাঁর দুই পা ও মোটরসাইকেলের ওপর দিয়ে চলে যায়। পরে চালক ট্রাক ফেলে পালিয়ে যান।
দুর্ঘটনার পর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তাঁর মাথার পেছনের অংশ ও বাম চোখেও গুরুতর আঘাত রয়েছে।
এ ঘটনার পর কাশিয়াডাঙ্গা কলেজ এলাকায় নেমে আসে শোক ও ক্ষোভের আবহ। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, কলেজের সামনে পুলিশ বক্স থাকলেও কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নেই। নেই স্পিড ব্রেকার, জেব্রা ক্রসিং কিংবা পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড। প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপার করলেও দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিক্ষোভকারীরা পুলিশ বক্সের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, নিয়মিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, স্পিড ব্রেকার নির্মাণ, জেব্রা ক্রসিং স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাইপাস মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে এবং উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন দুর্ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আহত কর্মকর্তার সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই স্পিড ব্রেকার নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং আমাদের সবাইকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় আহত কর্মকর্তার চিকিৎসা ও পরিবারের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে।
এ ঘটনায় আহত কর্মকর্তার ছোট বোনের স্বামী আজাহার ইসলাম বাদী হয়ে ট্রাকচালক রতন রায়ের বিরুদ্ধে কাশিয়াডাঙ্গা থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেছেন। পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করেছে এবং চালককে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে।
কাশিয়াডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফরহাদ আলী জানান, দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে এবং আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়; নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, নজরদারির ঘাটতি এবং অবহেলার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হিসেবেও স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
খবর২৪ঘন্টা/মইসে
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।