
নিউজ ডেস্ক: জ্বালানি সংকটে ভুগতে থাকা শিল্প ও ব্যবসা খাতে শীতকালের মধ্যে স্বস্তি আসবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, শীতকালে জ্বালানি পরিস্থিতিতে স্বস্তি আসবে এবং গ্রীষ্মকালে পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে বড় আকারের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য হাতে নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জ্বালানি সংকট ও এলএনজি সরবরাহ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
সম্প্রতি এলএনজি কার্গো না আসা প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, জ্বালানির কার্গোগুলো না আসার বিষয়টি সবাই জানেন। সেখানে ‘ফোর্স মেজর’ হয়েছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এ ধরনের ঘটনা নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ।
তবে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ওপর অভিঘাত বেশি পড়ছে বলে স্বীকার করেন তিনি। এর কারণ হিসেবে অতীতে পর্যাপ্ত মজুত না রাখার বিষয়টি তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, আগে যদি প্রয়োজনীয় মজুত রাখা হতো, তাহলে এ ধরনের ঘটনায় সংকটের মাত্রা এতটা হতো না।
তিনি বলেন, এখন সরকার এই পরিস্থিতি দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে। কাতার থেকেও জ্বালানি পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। কাতার বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চায়, তবে তারাও ফোর্স মেজরের পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে বলেও জানান উপদেষ্টা। তার ভাষ্য, কেপ অব গুড হোপ হয়ে জ্বালানি আনার সুযোগ থাকলেও সরকার সেটিও বিবেচনা করছে। যত রকমের বিকল্প পন্থা রয়েছে, সেগুলোর দিকে যাওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কার্গো পাওয়া গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হবে। এক দিন দেরি হলে সংকট আরও বাড়তে পারে।
মজুতের নতুন মানদণ্ড
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুত রাখার একটি মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান ড. তিতুমীর।
তিনি বলেন, শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব করলেই হবে না, জ্বালানির ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত মজুত রাখতে হবে। যেমন খাদ্যের ক্ষেত্রে চাল ও গমের নির্দিষ্ট পরিমাণ বাফার মজুত রাখার মানদণ্ড রয়েছে, তেমনি জ্বালানি ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও মজুতের নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক সংকট, সরবরাহ বিঘ্ন বা আকস্মিক পরিস্থিতি তৈরি হলেও যেন দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা না লাগে, সেজন্যই এই মজুত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
শীতে স্বস্তি, গ্রীষ্মে দৃশ্যমান অগ্রগতি
জ্বালানির অভাবে উদ্যোক্তাদের উদ্বেগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ড. তিতুমীর বলেন, শীতকালের মধ্যে একটা স্বস্তি আসবে। গ্রীষ্মকালে দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাবে।
তিনি বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে দেশের বড় আকারের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি চাহিদার সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে উৎপাদনমুখী ও শিল্পনির্ভর অর্থনীতির দিকে যেতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া শিল্পায়নের গতি বাড়ানো সম্ভব নয়।
গ্যাস অনুসন্ধানে জোর
দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেছেন উপদেষ্টা। তার মতে, অতীতে গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একইভাবে দেশের সম্ভাব্য কয়লা সম্পদ ব্যবহারের বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ ছিল না।
এখন নতুন করে দেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ব্লক দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রতিটি অনুসন্ধান কার্যক্রমে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে সম্পৃক্ত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সৌরবিদ্যুতে বড় লক্ষ্য
জ্বালানি নিরাপত্তায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন ড. তিতুমীর। তিনি বলেন, মানুষকে শুধু বিদ্যুতের গ্রাহক হিসেবে না রেখে বিদ্যুতের উৎপাদক হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। এজন্য নেট মিটারিং কার্যকর করা হচ্ছে। নেট মিটারিংয়ের আওতায় প্রায় ৩৬ হাজার আবেদন পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট সংস্থায় জনবল সংকট থাকায় বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
এলএনজি সংকটে বিকল্পের খোঁজ
বর্তমানে এলএনজি সরবরাহে তৈরি হওয়া সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন উৎস ও বিকল্প পরিবহনপথ বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা। কাতারের পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, দেশের স্বার্থই এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কোন উৎস থেকে কী মুদ্রায় জ্বালানি কেনা হবে, অর্থায়ন কীভাবে হবে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এমন চুক্তি করতে হবে, যেন দেশের ওপর অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ না পড়ে।
খবর২৪ঘন্টা/মইসে
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।