
নিউজ ডেস্ক: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বরকত উল্লাহ বুলু। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
রোববার (১৯ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভাসানী জনশক্তি পার্টির ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবলুর সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব ড. আবু ইউসুফ সেলিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান প্রমুখ।
আলোচনা সভায় জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, আমাদের সবার একটি যৌথ দায়বদ্ধতা রয়েছে, যাতে আমরা কোনোভাবেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হই।
তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে জনগণ ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ১৯৭১ সালকে ভিত্তিমূল বা বেইজ লাইন উল্লেখ করে তিনি বলেন, একে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই এবং ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের ত্যাগের সঙ্গে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই। শেখ মুজিব যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বের হয়ে বাকশাল ও একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছিলেন, তখনই তিনি নিজের পতন ডেকে এনেছিলেন।
অতীত রাজনীতির ইতিহাস টেনে জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ১৯৮৬ সালে জামায়াত ও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিয়ে এরশাদের স্বৈরাশাসনকে দীর্ঘায়িত করেছিল এবং ১৯৯৬ সালে জামায়াতের সমর্থন না পেলে শেখ হাসিনা কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারতেন না।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াতের কিছু কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, তারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে অন্য কাউকে সুবিধা দিতে চান কি না?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া নন-ডিসক্লোজার বা গোপন চুক্তি প্রসঙ্গে বুলু বলেন, এই চুক্তি বর্তমান সরকার করেনি, এটি পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়। এই চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হলে কোনো একক দলের পক্ষে তা সম্ভব নয়, বরং জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাবি তুলতে হবে।
দেশের চলমান সংকট উত্তরণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারেক রহমান দেশের মানুষকে সঠিক গন্তব্যে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ৪২টি রাজনৈতিক দলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় যে ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা তৈরি হয়েছে, তা-ই জাতির মুক্তির সনদ। এই ৩১ দফাকে সামনে রেখে সবাই এগিয়ে গেলে দেশের কোনো সংকট থাকবে না।
উপমহাদেশের মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর অবদান স্মরণ করে বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, মাওলানা ভাসানী ছিলেন নিপীড়িত মানুষের মুক্তির দূত। ক্ষমতার বাইরে থেকেও একটি রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালনা করার অনন্য ক্ষমতা তার ছিল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে তিনি যদি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে না দাঁড়াতেন, তবে শেখ মুজিবের মুক্তি হতো না।
বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ‘ধানের শীষ’ মূলত মাওলানা ভাসানীর প্রতীক ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মশিউর রহমান জাদু ভাই পল্টন ময়দানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী জিয়াউর রহমানের হাতে ধানের শীষ তুলে দেন এবং ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকে এটি বিএনপির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
শিক্ষা খাতে সাবেক সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে লেখাপড়া না করিয়ে অটো পাস এবং জিপিএ-৫ দেওয়ার যে সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল, তা জাতিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার প্রমাণস্বরূপ এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম নম্বরও পায়নি।
শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলনের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সংসদে ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বুলু বলেন, ড. মিলনের মতো একজন বিজ্ঞ ও মেধাবী মানুষের মুখ থেকে এমন বক্তব্য আসা ঠিক হয়নি, তবে তিনি যেহেতু পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চেয়েছেন, তাই এটি নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। একে কেন্দ্র করে অন্য কারও ইঙ্গিতে দেশকে অস্থিতিশীল করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা থেকে সবাইকে বের হয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রশ্ন তুলে বলেন, এই মুহূর্তে যদি বিএনপি ব্যর্থ হয় কিংবা কেউ যদি বিএনপিকে ব্যর্থ করে দিতে চায়, তবে কি জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতা গ্রহণ করবে? এর কোনো সম্ভাবনা বা বাস্তবতা কি এখন বাংলাদেশে আছে কি না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে সতর্ক করে সাইফুল হক বলেন, এই বাণিজ্য চুক্তি একটা সরকারকে ডুবানোর জন্য যথেষ্ট। এটি বহাল থাকলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে আর কোনো দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না।
সভাপতির বক্তব্যে রফিকুল ইসলাম বাবলু আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, জুলাই আন্দোলনের ডাকে জনগণ সাড়া দিলেও সেই সুফল এখনো তাদের ঘরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, ২৪ এর পরাজিত শক্তি ভারতে বসে হুমকি দিচ্ছে এবং তাদের মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনা নেই। তারা যে ২০০০ লোককে হত্যা করলো, ২৮ হাজার লোক আহত হয়ে পড়ে আছে এবং ৪০০০ লোক চক্ষু হারালো—সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের একটা কর্মীর মধ্যেও অনুশোচনা নেই। বরং তারা আবার দেশে ফেরার দম্ভোক্তি করছে।
বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার পেছনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যদি আপনাদের কোনো ইন্ধন থাকে তবে কেউ রেহাই পাবেন না, তাই এখনো সময় থাকতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
খবর২৪ঘন্টা/মইসে
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।