রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলায় গত ৭ মাসে ২৭১ টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের একটি বড় অংশ জুড়েই রয়েছে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে ৩১টি ডাকাতি ও ৭৫ টি ছিনতাইয়ের (দস্যুতা) অভিযোগ জমা পড়েছে থানাগুলোতে। অভিযোগ পড়লেও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে তৎপরতা কম পুলিশে। ফলে অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এনিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ জনগণ। তবে পুলিশ বলছে, অপরাধী চিহ্নিত করা সহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজ করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, গত ৭ মার্চ রাতে রাজশাহী নগরীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এক রিক্সা চালক নিহত হন। এই ঘটনায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে হত্যা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ নিহতের স্ত্রীর। একই ভাবে গত ১১ মার্চ রাজশাহীর তানোর উপজেলায় বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথিকে বরণ করা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে দলটির এক প্রবীণ কর্মী নিহত হন। এই ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি সহ বিএনপির মোট দুই নেতাকে বহিষ্কার করে দলটি। তবে পরিবারের দাবি এখন পর্যন্ত মূল আসামিদেরকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে গত ৯ মার্চ রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় নিজের জমিতে সেচ দিতে গিয়ে নিখোঁজ হন এক কৃষক। এর ৬ দিন পর তুলসীক্ষেত্র বিলের ডোবা থেকে ওই কৃষকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হলেও এই ঘটনাতেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। বিভাগ জুড়ে এমন অনেক শতাধিক চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড সহ অপরাধের ঘটনা আছে, যেসব অপরাধের মূল আসামিকে গ্রেপ্তার তো দূরের কথা উদ্যোশ পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। অবশ্য এই সময়ের মধ্যে একাধিক এমন ঘটনারও দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেসব ঘটনায় ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করতে গিয়ে বা অপরাধিকে আটক করতে গিয়ে স্বয়ং পুলিশ সদস্যরাই হামলার শিকার হয়েছে।
রাজশাহী ডিআইজি অফিসের দেয়া তথ্য মতে, গত ৭ মাসে হত্যা এবং ছিন্তাইয়ের মতো অপরাধ বেশি ঘটেছে বগুড়ায় এবং ডাকাতি বেশি হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলায়। তুলনামূলক অপরাধ কম হয়েছে জয়পুরহাট জেলায়। গত ৭ মাসে বগুড়া জেলায় হত্যা শিকার হয়েছেন ৬৪ জন, সিরাজগঞ্জে ৫০, পাবনায় ৩৮, নওগাঁয় ৩১, নাটোরে ২৬, রাজশাহীতে ২৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৪ এবং জয়পুরহাট জেলায় ১৩ জন। এছাড়া সিরাজগঞ্জে ডাকাতির ঘটনায় অভিযোগ জমা পড়েছে ১০ টি, নাটোরে ৬, নওগাঁয় ৫, পাবানয় ৩ , রাজশাহী ৩ এবং বগুড়ায় ৩টি। তবে চাঁপাইনপবাবগঞ্জে ডাকাতির কোন অভিযোগ পড়েনি। এদিকে দস্যুতা বা ছিন্তাইয়ের ঘটনায় বগুড়ায় অভিযোগ জমা পড়েছে ১৮ টি, নাটোরে ১১, রাজশাহীতে ১০, জয়পুরহাটে ৯, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮, নওগাঁয় ৭, সিরাজগঞ্জে ৭ এবং পাবনায় ৫ টি।
এদিকে ডিআইজি অফিসের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর আগস্ট মাসে সর্বোচ্চ ৭২ টি হতাকাণ্ড হয়। এর পর সেপ্টেম্বরে ৪৬, অক্টোবরে ২৯, নভেম্বরে ৪১, ডিসেম্বরে ৩১, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২২ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩০ টি হত্যার ঘটনা ঘটে। ডাকাতির ঘটনা ফেব্রুয়ারিতে এসে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মাসে মোট ১১টি এমন ঘটনায় থানায় অভিযোগ জমা পড়েছে। এর আগের মাসগুলোতে এই সংখ্যা ২ থেকে ৫ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গত ৭ মাসে হত্যা, ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৭৭ টি। যার মধ্যে হত্যাকান্ড ২৭১, ডাকাতি ৩১ এবং দস্যুতার মামলা ৭৫ টি।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজশাহী নগরীতে বিভিন্ন থানায় হামলা হয়। মহানগর ও জেলা পুলিশের বিভিন্ন থানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। পুড়িয়ে দেয়া হয় আরএমিপ হেড কোয়াটার সহ সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিকিউরিটি ক্যামেরার কন্ট্রোলরুম। নগরবাসীর নিরাপত্তায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত চার শতাধিক সিসি ক্যামেরাও ভেঙে ফেলা হয়। ফলে অকেজো হয়ে পড়ে নগরীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এতে অবনতির দিকে যেতে থাকে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অপরাধের পর আসামি শনাক্ত করতে না পারায় মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। এই সুযোগে বেড়েছে অপরাধ। দ্রুত সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো মেরামতের দাবি নগরবাসীর।
সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজনের রাজশাহী বিভাগের সভাপতি আহমদ সফিউদ্দিন বলেন, যেকোন গণঅভ্যুত্থানে পরে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ৭১ পরবর্তি স্বাধীনতার পরেও সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। শূন্যতা পুরণ করতে অনেক সময় লাগে। সুসংঘবদ্ধ রাজনৈতিক দল বা সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেয়নি। ফলে কিছু মানুষ এর সুযোগ নিচ্ছে। তারা লুটপাট ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে। এসব এক মাস বা ১৫ দিন মেনে নেয়া যায়। তবে এখনও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। প্রশাসনের সদিচ্ছার বা সক্ষমতার অভাব রয়েছে। সরকার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। প্রশাসনে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। মানুষকে সুসংগঠিত করতে হবে।
জেল থেকে অনেক অপরাধি বেরিয়ে এসেছে। তারা লুটেরাদের ছত্রছায়ায় চলে গেছে। বহু মনুষ কর্ম হারিয়েছে। এখন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উদাশিনতা রয়েছে। তারাও সরকার বা প্রশাসনকে সহযোগীতা করছে না। সাধারণ মানুষেরও রাজনীতিবীদদের ওপর আস্থা কমে গেছে। সংকট পরিকল্পনার, সংকট আন্তরিকতার, সংকট সমন্বয়হীনতার। পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটলে নতুন বোতলে পুরোনো মদই থেকে যাবে।
রাজশাহী রেঞ্জের মুখপাত্র ও অ্যাডিশনাল ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) সারোয়ার জাহান বলেন, অপরাধিদের শানাক্তের পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করা হচ্ছে। পুলিশ তৎপর রয়েছে।
ন/জ