
আশরাফুল হক, বিশেষ প্রতিবেদক: ভবানীগঞ্জ পৌরসভার মূল ফটকে এখন আর মেয়রের গাড়ি থামে না। দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মেয়র আব্দুল মালেক মন্ডল কারাগারে। প্রশাসনিক কক্ষে তাঁর চেয়ার খালি। কিন্তু স্থানীয়দের ভাষায়, ক্ষমতার কেন্দ্র খালি হয়নি। বরং মেয়রের অনুপস্থিতিতে আরও দৃশ্যমান হয়েছে এক ‘অদৃশ্য প্রশাসন’, যার কেন্দ্রে রয়েছেন সহকারী প্রকৌশলী ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্ব পালনকারী লিটন মিঞা।
২০২৪ সালের ১৯ মার্চ স্থানীয় কাউন্সিলরদের সংবাদ সম্মেলনের পর কেটে গেছে ২ বছর ৪ মাস ১৮ দিন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অভিযোগের তালিকা বড় হয়েছে, ক্ষোভ বেড়েছে, কিন্তু অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, অভিযোগ যদি মিথ্যা হয় তবে তদন্তের ফল প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? আর অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, ভবানীগঞ্জ পৌরসভায় কার্যত দুটি প্রশাসন চলে—একটি কাগজে, অন্যটি প্রভাবের বলে। ফাইলে সই করেন প্রশাসক, কিন্তু প্রকল্প, বিল, টেন্ডার, ঠিকাদার নির্বাচন থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেনের প্রায় সব সিদ্ধান্তেই লিটন মিঞার প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেছেন বর্তমান ও সাবেক একাধিক জনপ্রতিনিধি, কর্মচারী ও ঠিকাদার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেয়র আব্দুল মালেক মন্ডলের দীর্ঘ মেয়াদকালে যে দুর্নীতির কাঠামো গড়ে ওঠে, তার অন্যতম স্থপতি ছিলেন লিটন মিঞা। মেয়র অপসারিত হলেও কাঠামোটি অক্ষত রয়েছে। ফলে ব্যক্তি বদলেছে, কিন্তু পদ্ধতি বদলায়নি।
নথিপত্র, স্থানীয় সূত্র ও সাবেক কাউন্সিলরদের বক্তব্য ঘেঁটে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ বাগমারা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলররা অভিযোগ করেছিলেন যে মেয়র আব্দুল মালেক মন্ডল, প্যানেল মেয়র হাচেন আলী, দোলাহার হোসেন এবং সচিবের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী লিটন মিঞার যোগসাজশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি ছিল, ২০১৯ সালের ইজিপি প্রকল্পের প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ টাকার কাজ আংশিক বাস্তবায়ন করে পুরো বিল উত্তোলন করা হয়। এছাড়া ২০২২ সালের কোটেশন টেন্ডারের কয়েক লাখ টাকার কাজ বাস্তবায়ন না করেই অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছিল।
অভিযোগের তালিকা সেখানেই শেষ হয়নি। কাউন্সিলররা বলেন, ট্রেড লাইসেন্স বিক্রির অর্থ সরকারি হিসাবে জমা না দিয়ে গোপন খাতায় লেনদেন করা হয়েছে; পৌরকর আদায়ের অর্থের অংশবিশেষ কোষাগারে জমা হয়নি; নতুন পৌর ভবন নির্মাণে নিম্নমানের ইট, রড ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে; পৌরসভার জমিতে নির্মিত টিনের ঘর ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে; ট্রাক, রোলারসহ পৌরসভার যন্ত্রপাতি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়েছে; ভবানীগঞ্জ বাইপাস সড়কের একাধিক প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে; করোনাকালীন বরাদ্দের অর্থও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
পৌরসভার ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনা। ড্রেনেজ ও কালভার্ট নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, একই সড়কে বারবার মেরামতের নামে বরাদ্দ দেখানো, বাস্তবে কাজ না করেই কাগজে ‘সম্পন্ন’ দেখানো—এসব অভিযোগের কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে লিটন মিঞার নাম। স্থানীয়রা বলছেন, একজন প্রকৌশল কর্মকর্তার দায়িত্ব তদারকি করা; কিন্তু এখানে তদারকির জায়গাতেই প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি।
টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র কাগজে থাকলেও বাস্তবে কাজ ভাগাভাগি আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এক ঠিকাদার বলেন, “সমঝোতা ছাড়া এখানে কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।” তাঁর অভিযোগ, নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের বাইরে অন্যদের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে সরকারের অর্থ ব্যয় হলেও কাজের মান নিয়ে জনমনে আস্থা তৈরি হয়নি।
অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগ শুধু উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, পানি সংযোগ ফি এবং অন্যান্য নিয়মিত রাজস্ব খাত থেকেও আদায়কৃত অর্থ পুরোপুরি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিকল্প খাতায় লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণের একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু ছিল, যার তদারকির দায়িত্বে ছিলেন লিটন মিঞা।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো প্রশাসনিক নীরবতা। একাধিক কাউন্সিলর স্থানীয় সরকার বিভাগে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও শোনা গেছে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি, কিংবা অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাবেক কাউন্সিলর বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, সংবাদ সম্মেলন করেছি, তদন্তের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই। এতে সাধারণ মানুষ মনে করছে অভিযোগ করেও লাভ নেই।”
পৌরসভার এক কর্মচারী বলেন, “এখানে কাগজে প্রশাসন আছে, বাস্তবে অন্য প্রশাসন চলে। মেয়র না থাকায় এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও সহজ হয়ে গেছে।”
লিটন মিঞার দীর্ঘ কর্মকালও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে রয়েছেন। এ সময়ে একের পর এক মেয়র পরিবর্তিত হলেও তাঁর অবস্থান অপরিবর্তিত থেকেছে। ফলে তিনি প্রশাসনিকভাবে এমন এক প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন, যা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের চেয়েও স্থায়ী বলে মনে করেন অনেকে।
অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত মেয়র আব্দুল মালেক মন্ডলকে সরকার ২০২৪ সালের ১২ জুন সাময়িক বরখাস্ত করেছিল। পরে তাঁকে মেয়র পদ থেকেও অপসারণ করা হয়। কিন্তু একই অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ভবানীগঞ্জ পৌরসভাকে ঘিরে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি পৌরসভার সমস্যা নয়; এটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জবাবদিহির সংকটের প্রতিচ্ছবি। তাঁদের মতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অপসারণ করলেই দুর্নীতি বন্ধ হয় না, যদি প্রশাসনিক কাঠামো অক্ষত থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আব্দুল মালেক মন্ডলের মেয়াদকালের সব উন্নয়ন প্রকল্প ও আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ অডিট করতে হবে; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের অনুসন্ধান চালাতে হবে; এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবানীগঞ্জ পৌরসভা এমন এক উদাহরণ হয়ে থাকবে, যেখানে ব্যক্তি বদলায়, পদ বদলায়, প্রশাসনিক আদেশ বদলায়—কিন্তু দুর্নীতির কাঠামো বদলায় না।
এখন প্রশ্ন একটাই: অভিযোগের ২ বছর ৪ মাস ১৮ দিন পরও যদি কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না হয়, তাহলে এই দীর্ঘ নীরবতা কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি প্রভাবশালী এক কাঠামোকে রক্ষার অদৃশ্য ঢাল?
এ বিষয়ে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম আহমেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।