আজ শুক্রবার, ৩রা অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রাজশাহীতে বাড়ছে অপরাধ, খুন-চুরি ও ছিনতাই আতঙ্কে নগরবাসী

ছবি: প্রতিকি

বিশেষ প্রতিবেদক :
রাজশাহী মহানগরীতে চুরি, ছিনতাই ও খুনের ঘটনাসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়েই চলেছে। এতে চুরি, ছিনতাই ও খুন আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন নগরবাসী। বিশেষ করে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সেই সাথে নগরীর বিভিন্ন ফাঁকা রাস্তায় উচ্চ শব্দে বাইক চালকদের কারণে আরো আতঙ্কিত নগরবাসী। এসব যুবক বাইকাররা বড় বড় মোটরসাইকেল নিয়ে নগরীর তুলনামূলক কম জনবহুল রাস্তা ও মাঝে মাঝে জনবহুল রাস্তায় উচ্চ শব্দে যায়। তারা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে গিয়ে সাধারণ পথচারীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমন কাজ করে আসছে। সম্প্রতি নগরীর বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে, আরএমপির কর্নহার থানা এলাকায় স্ত্রীকে খুন করে স্বামীর থানায় আত্মসমর্পন, পবায় প্রকাশ্যে মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দিয়ে দু’জনকে হত্যা চেষ্টা, নগরীর ভুগরইল এলাকায় বাড়িতে হামলা

চালিয়ে প্রতিপক্ষরা পিতা-পুত্রকে গুরুতর আহত ও পরবর্তীতে মৃত্যু, দিনের বেলা দু’জন মোটরসাইকেল চালককে অন্য থানা এলাকা থেকে তুলে এনে মারধর, বেশ কয়েকটি বাড়িতে চুরি, মতিহার থানায় এলাকায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কর্তৃক গলায় ছুরি ধরে ছিনতাই চেষ্টা ও পবা থানা এলাকায় মামলা তুলে না নেওয়ায় বাদীর বাড়িতে আগুন দিয়ে পুরো পরিবারকে হত্যা চেষ্টা, কর্নহার থানা এলাকায় রাজমিস্ত্রী কাজে যাওয়ার সময় অপহরণকারী কর্তৃক অপহৃত ও পরে উদ্ধার ও সর্বশেষ মঙ্গলবার নগরীর বর্নালী মোড় এলাকায় রাজশাহী সরকারী সিটি কলেজ ছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা।
উপরে উল্লেখিত ঘটনা ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে নগরবাসী আইনশৃঙ্খলার অবনতির দিকেই ইঙ্গিত করছেন। কিন্ত এটি মানতে নারাজ নগর পুলিশ। নগর পুলিশের দাবি, দু’একটি ঘটনা ছাড়া বাকিগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আইন শৃঙ্খলার তেমন অবনতি ঘটেনি। তবে কয়েকটি হত্যা ও ছিনতাইয়ের ঘটনার পর নগরবাসী নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কারণ কখন, কিভাবে তাকে অকাতরে ঘাতকদের শিকার হতে হয়।

ছবি: প্রতিকি

জুলাই মাসে নগরীর কর্নহার থানা এলাকায় একজন স্বামী তার স্ত্রীর পরকিয়া বন্ধ করতে না পেরে ঠান্ডা মাথায় স্ত্রীকে খুন করে থানায় আত্মসমর্পন করে। পরে সে পুলিশের কাছে নিজের স্ত্রীকে খুন করার কারণ ব্যাখা করেন। যদিও মামলাটি তদন্তনাধীন রয়েছে। আসামী রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে। এ ঘটনার আগে রাজশাহীর পবা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দিন কথা কাটাকাটির জের ধরে দুই ব্যাক্তিকে ডেকে নিয়ে মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া ও তাদের হত্যা চেষ্টার ঘটনা ঘটে। পরে তারা স্থানীয়দের সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি হয়। নগরীর শাহমখদুম থানাধীন ভুগরইল পশ্চিমপাড়া এলাকায় প্রতিপক্ষরা বাড়িতে হামলা চালিয়ে পিতা-পুত্রকে কুপিয়ে আহত করে। পরে স্থানীয় তাদের উদ্ধার

করে হাসপাতালে ভর্তি করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেলিম নামের যুবক মারা যায়। ওই ঘটনায় ভুগরইল এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ চারজনকে গ্রেফতার করে। তারপরে নগরীর পবা থানা এলাকা থেকে দুইজন মোটরসাইকেল চালককে দিনের বেলা অপহরণকারী অপহরণ করে শাহমখদুম থানা এলাকায় নিয়ে এসে মারধর করে। পরে পুলিশি তৎপরতায় অপহরণকারীরা তাদের ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। উদ্ধার করে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ছাড়াও প্রায় নগরীর বেশ কয়েকটি বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। নগর পুলিশের পেট্রোল টিম থাকার পরেও কিভাবে চুরি ও ছিনতাই হয় এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। শুধু তাই নয় নগরীর মতিহার থানায় এলাকায় দুইজন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গলায় ছুরি ধরে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। পরে তারা পুলিশের হাতে আটক কয়। তার আগে পবা থানা এলাকায় বাদী মামলা তুলে না নেওয়ায় বিবাদীরা রাতের আঁধারে বাড়িতে আগুন দিয়ে পুরো পরিবারকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে। মানুষ না মারা গেলেও ওই ঘটনায় হাঁস, মুরগি ও ছাগল মারা যায় এবং গরু পুড়ে আহত হয়। গত কয়েকদিন আগে নগরীর কর্ণহার থানা এলাকায় এক রাজমিস্ত্রী কাজে যাওয়ার সময় অপহরণকারীদের হাতে অপহৃত হয়। ঘটনার পর অপহৃতের স্ত্রীর ফোনে কল দিয়ে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। মুক্তিপণ না দিলে মেরে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওইদিনই অপহৃতকে উদ্ধার করে ও একজনকে আটক করে। জুলাই মাসে রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মচারীকে সাদা মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করা হয়। দিনের বেলায় তাকে নগরীর শালবাগান এলাকা থেকে প্রকাশ্যে অপহরণ করা হয়। এভাবে একের পর এক অপহরণের ঘটনা ঘটছে। তারও আগে এক ব্যবসায়ীকে

অপহরণ করে মারধর করা হয় ও ফাঁকা চেকে সই নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয় সেই ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে।
সর্বশেষ মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নগরীর বোয়ালিয়া থানা এলাকার বর্নালী মোড় ও হেতেমখাঁন এলাকা মাঝামাঝি রাস্তায় দুর্বৃত্তরা রাজশাহী সিটি কলেজের ছাত্র ফারদিন আশারিয়া রাব্বিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। তারা তাকে হত্যা করে ফেলে রেখে যায়। অথচ ওই ছাত্রের পকেটে মানিব্যাগ ও মোবাইল ছিলো। তার কাছ থেকে তেমন কিছু খোয়া যায়নি। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রামেক হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরে ওই ঘটনায় নিহতের বড় বোন মানছুরা পারভিন বাদী হয়ে বোয়ালিয়া মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় বুধবার রবিন নামের একজনকে আটক করে পুলিশ। তাকে রিমান্ডে নেওয়া হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এদিকে, ভোর বেলা প্রকাশ্যে রাস্তায় মেধাবী ছাত্র খুন হওয়ার ঘটনায় নগরজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নগরবাসীর নিরাপত্তার বিষয়টিও নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। রাস্তায় এক কলেজ ছাত্রকে কেন খুন হতে হবে তার বিষয়টিও বুঝতে পারছেন না তারা। শিক্ষা নগরীতেই শিক্ষার্থীকে ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারাতে হলো এই বিষয়টি যেন কেউ মেনে নিতে পারছেন না। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশের টহল বেশি দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী। যাতে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এমন ঘটনায় উদ্ভিগ্ন হয়ে পড়েছেন স্থানীয়রাও। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটারই একটি নমুনা বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ছাত্র খুন হওয়ার ঘটনায় শিক্ষা নগরী রাজশাহীতে পড়তে আসা অন্যান্য ছাত্রদের মাঝেও ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। তারা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন।
আব্দুল্লাহ নামের একব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, দিন দিন শিক্ষানগরী রাজশাহী অশান্ত হয়ে উঠছে। নগরীতে অপরাধীরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। অপরাধীরা যাতে আর মাথা চাড়া দিতে না পারে সেজন্য এখনই প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটারই একটি ইঙ্গিত। এখনতো ভোর বেলা বা রাতে একা বের হতে ভয় লাগবে।
রাহিমুল নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, রাজশাহী শিক্ষা নগরী। এখানে পড়তে এসে যাতে আর কাউকে খুন না হতে হয় সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উঠিত। সবুজ নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, স্থানীয় কিছু বখাটেদের সাথে মিশে পড়তে আসা সাধারণ ছাত্ররা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। চুরি-ছিনতাই রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেক ছাত্রছাত্রী মাদকের

ছবি: প্রতিকি

কবলে পড়ে অপরাধের সাথে জড়াচ্ছে। এদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক থাকবে ও অপরাধও কমে যাবে। জব্বার নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, নগরীতে কিছু বখাটে যুবক উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চালিয়ে অন্যান্য পথচারীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
আইনশৃঙ্খলার তেমন অবনতি ঘটেনি জানিয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, দুই একটি ঘটনা ছাড়া বাকিগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। অপরাধ করে পার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। যে ঘটনাগুলো ঘটেছে জড়িত প্রত্যেককেই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। যারা উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চালায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাস্তা-ঘাটে এমন অবস্থা কেউ দেখলে বা কোন বখাটেকে অন্যায় করতে দেখলে পুলিশকে জানালে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়গুলো পুলিশকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হলো।

আর/এস


Download our Mobile Apps Today