
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: ডেঙ্গু সংক্রমণে টানা আট মাস ধরে দেশের জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, ঘটছে প্রাণহানিও। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। শয্যা ও চিকিৎসক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌর এলাকার ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। এতে এডিস মশার প্রজননের ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে, মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মসজিদপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আলিম বলেন, তাদের মহল্লায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কেউ না কেউ জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। এলাকায় মশার উপদ্রবও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। দিনের বেলাতেও মশার উৎপাত থাকে, আর সন্ধ্যা হলেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। মশারি ছাড়া ঘরে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এই মহল্লায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারপরও মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। তারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, এলাকায় মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে দিনের বেলাতেও কোথাও স্বস্তিতে বসে থাকা যায় না। ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই মশার উৎপাত। ডেঙ্গুর ভয় তো রয়েছেই, এর মধ্যে তার অনেক স্বজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। একের পর এক মানুষের মৃত্যুতে তারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কখন নিজের পরিবারের কেউ আক্রান্ত হন, সেই ভয় সব সময় কাজ করছে। দ্রুত মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
শহরের শান্তিমোড় এলাকার বাসিন্দা আতাউর রহমান বলেন, শহরের প্রায় সব এলাকাতেই ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা। অনেক জায়গায় ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ চললেও তা পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে না। কোথাও ড্রেনের কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে, আবার কোথাও পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে রয়েছে। ফলে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এসব জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর আশঙ্কা বাড়ছে।
সীমিত শয্যা ও চিকিৎসক দিয়ে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। শয্যা সংকটে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝে, এমনকি সিঁড়িতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ডেঙ্গু করোনার চেয়েও বেশি ভয়াবহ। এখন পর্যন্ত ৭৫ থেকে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাই দ্রুত ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল এনে চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার বলেন, টানা ফেব্রুয়ারি মাসের পর থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যায় দেশের জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ড্রেনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে। এতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও ছড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যাপ্ত থাকলেও চিকিৎসক সংকটে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতাল ২৫০ শয্যার হলেও অন্তত ৭০০ রোগী ভর্তি থাকছেন। এতে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমনকি তিনি নিজেসহ হাসপাতালের অন্তত ৪০ জন স্টাফ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার ১৫২টি বসতবাড়ির জমে থাকা পানি পরীক্ষা করে ৩৬ শতাংশ বাড়িতেই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। বিপুলসংখ্যক বাড়িতে এডিসের লার্ভার উপস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন অর রশীদ বলেন, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে মশার প্রজনন ও ডেঙ্গুর লার্ভা বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে। তবে জলাবদ্ধতা নিরসন ও মশার বংশবিস্তার রোধে পৌরসভার পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে। এ জন্য বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিশেষ টিম গঠন করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব টিম নিয়মিত মশার লার্ভা শনাক্ত ও ধ্বংস করার পাশাপাশি ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটাচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, পৌর এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ মোকাবিলায় আটটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়মিত কাজ করছে। মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, এডিস মশার লার্ভা নিধন এবং জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খবর২৪ঘন্টা/এসএফ
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।